স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আভোকাডোর উপকারিতা সম্পর্কে জানুন
কিসমিস ভিজিয়ে খেলে কি উপকার হয়অ্যাভোকাডো একটি অসাধারণ পুষ্টিগুণ সম্পন্ন ফল। পুষ্টিবিদদের কাছে এই ফলটি
সুপারফুট হিসেবে পরিচিত কারণ অন্যান্য ফলে মূলত বেশিরভাগ কার্বোহাইড্রেট পাওয়া
যায় কিন্তু এই ফলে স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের পরিমাণ বেশি। অ্যাভোকাডোতে প্রায় ২০
রকমের ভিটামিন এবং খনিজসহ বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়।
এ পোষ্টের মাধ্যমে আমরা আলোচনা করেছি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অ্যাভোকাডোর উপকারিতা,
ত্বকের যত্নে ব্যবহার ও খাওয়ার নিয়ম। তাই এগুলো জানতে পোস্টটি মনোযোগ সহকারে
পড়ুন।
ভূমিকাঃ
অ্যাভোকাডো আমাদের কাছে অতটা পরিচিত ফল না হলেও পুষ্টিগুণ বিচারে এটি সবার সেরা।
স্বাস্থ্য সচেতন ব্যক্তিদের কাছে এটি অনেক জনপ্রিয় একটি ফল।ফলটির উচ্চপুষ্টি মান
এবং অনন্য সাধের কারণে বিভিন্ন রকম খাবার তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। যারা ওজন কমাতে
চান তারা নিঃসন্দেহে আপনার খাবার তালিকায় অ্যাভোকাডো রাখতে পারেন।
আরো পড়ুনঃ বেদানা খাওয়ার উপকারিতা সম্পর্কে জানুন
অ্যাভোকাডো আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং হজমে সহায়তা করে।
প্রতিদিনের খাবার তালিকায় একটি অ্যাভোকাডো রাখলে হঠাৎ হার্ট এটাকে মৃত্যুর
সম্ভাবনা হ্রাস পায়।
অ্যাভোকাডো ফল পরিচিতিঃ
অ্যাভোকাডো একটি বিদেশি ফল। প্রায় ১০ হাজার বছর আগে থেকে মেক্সিকোতে এই ফল চাষ
হয়ে আসছে। অ্যাভোকাডোর প্রজনন বীজ ও কলম দুই ভাবে করা যেতে পারে। কলমের মাধ্যমে
প্রজননে এর জাতের বিশুদ্ধতা বজায় থাকে এবং ফলন ভালো হয়। যারা বপন করা থেকে গাছে
ফল আসা পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চল বেদে ৮ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।
অ্যাভোকাডো ফলের আকার এবং রং বিভিন্ন রকমের হয়। ফল হয় নাশপাতি আকৃতি থেকে
কিছুটা গোলাকার এবং সবুজ থেকে কালো রঙের পর্যন্ত হয়ে থাকে। অ্যাভোকাডো ২২০ গ্রাম
থেকে সর্বোচ্চ ১.৪ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। ফলের ভেতরের অংশ দেখতে হলুদ ও সবুজ।
ফলের ভেতরের এই হলুদ সবুজ অংশটুকুই খেতে হয় আর খোসা ও বিচি ফেলে দিতে হয়।
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অ্যাভোকাডোর উপকারিতাঃ
ওজন কমাতে সাহায্য করেঃ স্বাস্থ্য সচেতন ব্যক্তিদের কাছে অ্যাভোকাডো বেশ
জনপ্রিয় একটি ফল। অ্যাভোকাডো ওজন কমাতে বেশ কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। একটি
সমীক্ষায় দেখা গেছে খাবারের সাথে অ্যাভোকাডো খেলে ২৩% বেশি তৃপ্তি পাওয়া যায়
এবং যারা এই ফলটি খান না তাদের তুলনায় পরবর্তী ৫ ঘণ্টায় তাদের খাওয়ার ইচ্ছা
২৮% কম হয়।
তাই ডায়েটে অ্যাভোকাডো অন্তর্ভুক্ত করলে স্বাভাবিকভাবেই কম ক্যালরি খেতে সহায়তা
করবে। অ্যাভোকাডো উচ্চ ফাইবার সমৃদ্ধ এবং নিম্ন কার্বস বিশিষ্ট হয়ে থাকে যা ওজন
হ্রাস এর প্রক্রিয়াকে সহজতর করে তোলে।
ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করেঃ ক্যান্সার প্রতিরোধে অ্যাভোকাডো খুবই
উপকারী একটি ফল। ক্যান্সারের কোমো থেরাপির পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হ্রাস করতে
সহায়তা করে অ্যাভোকাডো। প্রোস্টেট ক্যান্সারের কোষগুলিকে বৃদ্ধি হতে বাধা দেই
অ্যাভোকাডো।
শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধঃ অ্যাভোকাডো অত্যন্ত শক্তিশালী
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ একটি ফল। এটি কেবল অন্যান্য খাবার থেকে
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শোষণের ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে তাই নয় এটি উচ্চমাত্রার
অ্যান্টিঅক্সট সমৃদ্ধ। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে সালাদ বা রান্নাই অ্যাভোকাডো
বা অ্যাভোকাডো তেল যোগ করা হলে এটি এন্টি অক্সিডেন্ট ২.৬ শোষণকে ১৫% পর্যন্ত
বৃদ্ধি করতে পারে।
চোখের স্বাস্থ্য রক্ষায়ঃ অ্যাভোকাডোর মধ্যে রয়েছে ক্যারোটিনয়েডস লুটেইন
এবং জেক্সানথিন এর মত উপাদান যা চোখের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যাভোকাডোতে ভিটামিন ই এবং মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট রয়েছে যা বিভিন্ন খাবার থেকে
বিটা-কারোটিন এবং লুটিন এর মত প্রতিরক্ষামূলক ক্যারোটিনয়েডের শোষণ বৃদ্ধি করে।
বিটা-ক্যারোটিন ভিটামিন এ তে রুপান্তরিত হয় যা চোখের দৃষ্টিশক্তির জন্য খুবই
অপরিহার্য।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করেঃ অ্যাভোকাডো আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ
ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। এর মধ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন পুষ্টিগুণ উপাদান
আমাদের শরীরের জন্য খুবই উপকারী। এই ফলের মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি
আর এই ভিটামিন বি শরীরের রোগ জীবাণু থেকে আমাদের শরীরকে রক্ষা করে। অ্যাভোকাডো
কেবল উচ্চ পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবারই নয় বরং এটি আপনার গ্রহণ কৃত বিভিন্ন খাবারের
পুষ্টির মান চমৎকারভাবে বাড়িয়ে তুলতে পারে।
হৃদ রোগের ঝুঁকি কমায়ঃ বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ।
কোলেস্টরলের মাত্রা বৃদ্ধি, ট্রাই গ্লিসারাইডস ওর উচ্চ রক্তচাপ হৃদরোগের প্রধান
কারণ। বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে অ্যাভোকাডো কোলেস্ট্রলের মাত্রা
উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস করে। ২০% পর্যন্ত রক্তের ট্রাই গ্লিসারাইড হ্রাস করে।
এলডিএল কোলেস্টেরল বা ২২% পর্যন্ত কমিয়ে দেয় এবং এলডিএল (ভালো) কোলেস্টেরল ১১%
পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।
উচ্চ ফাইবার সমৃদ্ধঃ অ্যাভোকাডো একটি উচ্চ ফাইবার যুক্ত ফল।ফাইবার এমন
একটি পুষ্টি উপাদান যা ওজন কমাতে অবদান রাখে, রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে
রাখে এবং সেই সাথে আরো অনেক রোগের ঝুঁকি কমায়। অ্যাভোকাডোতে প্রায় ২৫% দ্রবণীয়
ফাইবার এবং ৭৫%অদ্রবনীয় ফাইবার থাকে। দ্রবণীয় ফাইবার আমাদের অন্ত্রের
বন্ধুত্বপূর্ণ অন্ত্র-ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য যা শরীরের অনুকূল কার্যকারিতার জন্য
খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চ পটাশিয়াম সমৃদ্ধঃ কলাতে যে পরিমাণ পটাশিয়াম থাকে তার চেয়ে বেশি
পরিমাণ পটাশিয়াম থাকে অ্যাভোকাডোতে। ১০০ গ্রাম কলাতে ১০% কিন্তু অ্যাভোকাডোতে
পটাশিয়াম থাকে ১৪%। পটাশিয়াম এমন একটি পুষ্টি উপাদান যা বেশিরভাগ মানুষ
পর্যাপ্ত পরিমাণে পাই না। বেশ কয়েকটি গবেষণা রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, উচ্চ
পটাশিয়াম রক্তচাপ্রাস করে যা হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং কিডনি ফেইলিউরের ঝুঁকি
কমাতে সাহায্য করে।
আরো পড়ুনঃ খালি পেটে আপেল খেলে কি হয় জানুন
বাতরোগ থেকে মুক্তিতে সহায়তাকারীঃ আর্থ্রাইটিস বা বাতরোগ একটি
দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। এই রোগে মানুষকে সারা জীবন ধরে ভুগতে হয়। একাধিক গবেষণায়
দেখা গেছে যে অ্যাভোকাডো ও সয়াবিন তেল এক্সট্রাক্ট অস্টিও আর্থ্রাইটিস হ্রাস
করতে পারে।
কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করেঃ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে অ্যাভোকাডো বেশ উপকারি একটি
ফল। অর্ধেক অ্যাভোকাডো ফলের জন্য ৬-৭ গ্রাম ডায়েটারি ফাইবার সরবরাহ করে যা
দ্রবণীয় এবং অদ্রবণীয় মিশ্রণ। দ্রবণীয় ফাইবার মলকে নরম করে এবং যাতায়াত সহজ
করতে জল শোষণ করে।
অন্ত্রের ভাল স্বাস্থ্য বজায় রাখেঃ অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে
অ্যাভোকাডো ফলের বেশ গুরুত্ব রয়েছে। অ্যাভোকাডো তে থাকা ফাইবার অন্ত্রে উপকারী
ব্যাকটেরিয়া খাওয়ায় ও মাইক্রোবিয়াল ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।
অ্যাভোকাডোতে থাকা ফাইবার অন্ত্রের ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিকেও সীমিত করতে
পারে।
ত্বকের যত্নে অ্যাভোকাডোঃ
অ্যাভোকাডো আমাদের শরীরের জন্য যতটা পুষ্টিকর ঠিক তেমনি ত্বকের যত্নেও অনন্য এ ফল। এই ফলে রয়েছে ভিটামিন এ, বি, কে,সি, বি১,বি২,বি৫ এবং ভিটামিন বি৬। এছাড়াও এই ফলে থাকা পটাশিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম, কপার, আয়রন জিংক সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান যা ত্বকের জৌলুস ফিরিয়ে নিয়ে আসে।- অ্যাভোকাডো ও ওটমিল দিয়ে এই ফেসপ্যাকটি তৈরি করতে হয়। ওটমিল সামান্য গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে এবং একটি অ্যাভোকাডো চটকে নিয়ে একসঙ্গে নেড়েচেড়ে পেস্ট তৈরি করতে হবে। পেস্টটি ঠান্ডা হলে ত্বকে লাগাতে হবে কিছুক্ষণ পর হালকা কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।
- এই ফেসপ্যাক টি তৈরি করতে অ্যাভোকাডো, মধু ও ডিম লাগবে। দুইটি অ্যাভোকাডোর শাঁস চটকে নিয়ে সাথে ২ চা চামচ মধু মেশাতে হবে। এরপরে একটি ডিম দিয়ে সাথে কিছু হালকা কুসুম গরম পানির সাথে পুরো মিশ্রণটি মিশিয়ে নিতে হবে। মুখ ও গলার আশেপাশে এই প্যাকটি লাগাতে হবে এবং কিছুক্ষণ পর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। দাগ দূর করে ত্বক উজ্জ্বল করবে এই ফেসপ্যাক।
- এই ফেসপ্যাকটি খুব সহজেই তৈরি করতে পারবেন। একটি অ্যাভোকাডো চটকে নিয়ে সাথে মধু মিশিয়ে নিয়ে তৈরি করুন ফেসপ্যাক। এটি প্রাণহীন ত্বকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে লাবণ্য।
অ্যাভোকাডো খাওয়ার নিয়মঃ
অ্যাভোকাডো শুধু যে স্বাস্থ্যকর তা নয় এটি বেশ সুস্বাদু। এটি বিভিন্ন ধরনের
খাবারের সাথেও খাওয়া যায়। সালাদ ও বিভিন্ন রকম রেসিপিতে যুক্ত করেওখাওয়া যায়
না অ্যাভোকাডো। এর একটি চর্বিযুক্ত ও ক্রিমি গঠন রয়েছে যা অন্যান্য উপাদানগুলোর
সাথে ভালোভাবে মিশ্রিত হয়। অ্যাভোকাডো পাকতে কিছুটা সময় নেই এবং পাকলে তা
কিছুটা নরম ধাচের হয়।
লেখকের মন্তব্যঃ
অ্যাভোকাডো একটি উচ্চ পুষ্টি গুণসম্পন্ন ফল। আধুনিক ডায়েটের সব ধরনের পুষ্টির
অভাব পূরণ করতে সক্ষম এই ফল। এটি খেতে যেরকম সুস্বাদু তেমনি ওজন কমাতে কার্যকরী ও
হৃদপিন্ডের জন্য বেশ স্বাস্থ্যকর।
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অ্যাভোকাডোর উপকারিতা সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হয়েছে।
আমাদের এই পোস্টটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে তবে অবশ্যই শেয়ার করে দিবেন এবং কোন
মতামত থাকলে কমেন্টে জানাবেন।
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url